সাংগঠনিক পদ-পদবির দ্বন্দ্ব! কোনদিকে যাচ্ছে পেশাগত সম্মান?

নিজস্ব প্রতিবেদক:

সাংগঠনিক পদ-পদবির দ্বন্দ্ব! কোনদিকে যাচ্ছে পেশাগত সম্মান? পেশাগত সম্মান ও দাবী আদায়ে কম বেশি সরকারি বেসরকারি প্রায় সকল পেশাজীবীদেরই পেশাগত সংগঠন রয়েছে বাংলাদেশে৷ কিন্তু বেসরকারি শিক্ষকদের বেলায় এটি ভিন্ন৷ বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদরাসার শিক্ষকদের প্রতি বৈষম্য ও শিক্ষকের সংখ্যাও যেমন বেশি তেমনি সংগঠনের সংখ্যাও চোখে পরার মত৷ আশির দশক থেকেই বেসরকারি শিক্ষকেরা দফায় দফায় আন্দোলন সংগ্রাম করে বেতন শতভাগ অর্জন করাসহ সামান্য কিছু ভাতাও অর্জন করেছেন৷ তাদের আন্দোলনের কর্মসূচী ছিল সুশৃংখল, শিখনীয় ও অনুকরণীয়৷ যেহেতু শিক্ষকদের আন্দোলন, সর্বত্র শিক্ষার গন্ধই ছড়াতো৷ কিন্তু সম্প্রতি ফেসবুকে সরব কিছু স্বস্বীকৃত ও প্রাপ্ত নেতার কর্মকান্ড, কাদা ছিটানো লেখালেখি দেখলে শিক্ষকদের সেই পুরানো ঐতিহ্য সব যেন মুছে নিজদের কপালে মোটা করে ভিন্ন রংগের তিলক দেয়ার মত মনে হয়৷ পদ-পদবির দ্বন্ধে একই সংগঠন ব্র্যাকেট বন্দিতে হয় কয়েকটি৷ বর্তমানে আবার সংগঠনের নাম ও লগো নিয়ে একে অপরের সাথে মারমুখি অবস্থা৷ ২০০৬ সালে মুক্তাঙ্গনে শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ মো. সেলিম ভূইয়ার নেতৃত্বে প্রায় এক-দেড় লাখ শিক্ষকের সমন্বয়ে শতভাগ বেতনের দাবীতে আন্দোলন চলছিল৷ আরেক শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ মো. শরিফুল ইসলামের নেতৃত্বে শহিদ মিনারের পাশে চলছিল একই দাবীতে আরেক কর্মসূচী৷ কিন্তু কেউ কারো বিরোদ্ধে বর্তমানের মত আক্রমনাত্মক ভাষা ব্যবহার করতে শোনা যায় নাই৷ মহাসম্মেলনের চুড়ান্ত দিনে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী জনাব ড. ওসমান ফারুক শিক্ষকদের শতভাগ বেতন ঘোষণা করতে এসে মুক্তাঙ্গনের কর্মসূচীতে তাঁর বক্তব্যের এক পর্যায় বলেছিলেন, ”সবাই বেসরকারি শিক্ষক, কিন্তু আপনাদের কর্মসূচী দুই জায়গায় কেন?” উত্তরে কোনো নেতাই অন্যের বিরোদ্ধে একটু টু শব্দও করেন নাই৷ কিন্তু বর্তমানে কি যেন চলছে! কারো কারো লেখা পড়লে মনে হয় যেন তিনি শিক্ষক নন, শুধু নেতা! চলতি বছর অবসর নেয়া এক প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও সাবেক শিক্ষক নেতা আলাপ করতেছিলেন তাঁর কর্মজীবন ও সংগ্রামী জীবন নিয়ে৷ তিনি আক্ষেপ করে বললেন, ”৩৪ বছর শিক্ষকতা করেছি সকল আন্দোলনে শরিক হয়েছি৷ অনেক আন্দোলন ও ত্যাগের বিনিময়ে করে শতভাগ বেতন পেয়েছি; কিন্তু সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নাম লেখানোর সাহস ও সুযোগ পাই নাই৷ এখন ফেসবুক খুলে দেখি তিন বছর পূর্বে আমাদের ত্যাগের বিনিময়ে প্রাপ্ত শতভাগ বেতনসহ কিছু ভাতা প্রাপ্ত শিক্ষক উপজেলার কোনো শিক্ষক নেতার সাথে পরিচয় নাই সেও নাকি সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতা!” কথাটা শুনে মনে হলো, বর্তমানে শিক্ষক নেতার নেতৃত্ব ও পদ-পদবি যেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হয়! শেষ হবে যেন কোনদিকে? এভাবেই শিক্ষকতার মান অনেকটা নিচে নেমেছে, পাবলিক প্লেসে একে অপরের বিরোদ্ধে এত বিষেদগারে যেন সম্মান এখন কোন দিকে যায়? তবে গুটি কয়েক জনের হাতে গোটা শিক্ষক সমাজের মান সম্মান ইজারা দেয়া হয় নাই যে তারা মুখে আসবে তাই বলবে, আর তাদের জন্য পুরো শিক্ষকদের মান সম্মান সমাজে প্রশ্নের মুখে পরবে? এজন্য অবশ্যই জবাব দিতে হবে৷ মাঝে মাঝে মনে যতটা সময় কাদা ছিটানের কাজে ব্যয় করা হয় ততটা সময় যদি শিক্ষা ও শিক্ষার মানোন্নয়নে চিন্তা করতো, শ্রেণিকক্ষগুলো পরস্পর শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে আরো অনেক দূর এগিয়ে যেত৷ নেতৃত্ব ও নেতা যোগ্য, ধৈর্য্য ও দক্ষতার ব্যাপার; এটা ক্যানভাসারের মত নয়৷ গাছের গোড়া দিয়ে উপরে না উঠে সরাসরি আগায় উঠা শিক্ষকতার বয়স দশের নিচে এক তথাকথিত নেতার প্রতিষ্ঠানের প্রধান এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে তিনি ক্ষিপ্তভাবে বললেন, ”ফেসবুকে যা দেখি এগুলো নেতৃত্বের গুণাবলি নয়৷ এতে তার পাশাপাশি আমার প্রতিষ্ঠানের মানও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে৷ ফেসবুকে অন্যের সমালোচনায় যতটা লিপ্ত তার কিঞ্চিত পরিমাণ যদি বই পড়া ও শিক্ষা সম্পর্কিত গবেষণায় ব্যয় করত তাহলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের অনেক দক্ষতা বাড়তে৷” ২০০৫ সালে নিয়মিত শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেছি৷ প্যাটার্ণের ঝামেলার কারণে এমপিওভুক্ত হতে পারি নাই৷ তাই নিবন্ধন দিয়ে আবার নতুন করে ২০০৮ সালে অন্য স্কুলের শিক্ষক হয়েছি৷ কোনো কারণ ছাড়াই আরো ১৩ মাস পরে এমপিওভুক্ত হয়েছি৷ কিন্তু ২০০৬ সাল থেকে সংগঠন কিংবা ব্যক্তি বিবেচনা ব্যতিরেকে গত ইদুল ফিতরের দিনের কর্মসূচীসহ উপজেলা, জেলা পর্যায়সহ সকল আন্দোলনে যোগদান করেছি৷ এমপিওভুক্ত না হয়েও শতভাগ বেতনের আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলাম৷ দেশের স্বনামধন্য কিছু স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের শিক্ষক নেতাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি ও তাঁদের সংস্পর্ষে থেকেছি, কিন্তু এখনকার এরকম পরিবেশ আর দেখা যায় নাই৷ এমনতেই শিক্ষা ডিপার্টমেন্টের নীতিমালার অভাব নাই, মনে হচ্ছে শিক্ষক সংগঠন তৈরিতেও নীতিমালার প্রয়োজন হবে৷ একজন শিক্ষক ফেসবুকে দুই লাইন লিখতে পারলেই একটা সংগঠনের নাম লিখে নিজকে সে সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা, সভাপতি দাবী করে সর্বক্ষণ লেখতেই থাকে৷ যেন পাঁচ লাখ শিক্ষক তাঁকে নির্বাচীত করেছেন৷ পাগলও তাকে কেউ খারাপ কিছু বললে সে বুঝতে পারে, শিক্ষক হয়েও সে বুঝে না যে তার ঢাল ও টাল মাথার লেখায় সবাই বিরক্ত এবং সহ্য করছে না৷ পরিশেষে বলতে চাই, সংগঠন ও পেশাগত দাবী আদায়ে কর্মসূচী গণতান্ত্রিক অধিকার৷ এটি যেমন ব্যক্তি অধিকার নয়, তেমনি ব্যক্তিগত কাজও নয়৷ ব্যক্তিগত দ্বন্ধ বা সুনামের জন্য সমাজে নেতিবাচক কিছু করলে সমাজে শুধু ব্যক্তির নয় পুরো শিক্ষক সমাজেরই সুনাম ক্ষুন্ন হয়৷ ভালো করতে গিয়ে যেন খারাপ না হয় সে দিকে খেয়াল রাখা উচিত৷

লেখক- মোহাম্মদ মহসিন মিয়া

সহকারী প্রধান শিক্ষক

2,201 total views, 1 views today

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Lost Password?