উপজেলা থেকে বিচ্ছিন্ন গ্রাম তিতাসের নারান্দিয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক:
একটি দেশের উন্নতি বা অবনতি সম্পূর্ণ নির্ভর করে ঐ দেশের যোগাযোগ ব্যাবস্থার উপরে৷ আবার একটি দেশের শিক্ষিতের হারেই বলে দেয় ঐ দেশটি কত উন্নত৷ স্বাধীনতার ৪৯ বছর চলছে৷ বাংলাদেশের চেহারা বিস্ময়করভাবে পরিবর্তন হয়েছে৷ সারাবিশ্বের সাথে এ দেশের অর্থনীতি পাল্লা ধরে বেড়ে চলছে৷ প্রায় প্রতিটি গ্রামে রাস্তা নির্মাণ হয়েছে, এমনকি একই গ্রামের বিভিন্ন পাড়া মহল্লায়ও রাস্তা নির্মাণ হয়েছে৷ পাকাও হয়েছে একাধিকবার৷ বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার- ”গ্রাম হবে শহর” পরিকল্পণায় বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রাম থেকে গ্রামে সংযোগ সড়ক নির্মাণসহ পাকা করা হচ্ছে৷ কিন্তু স্বাধীনতার ৪৯ বছরেও একটি পূর্ণাঙ্গ রাস্তা নির্মাণ হয়নি কুমিল্লা জেলার তিতাস উপজেলার অন্তর্গত ৭নং ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের নারান্দিয়া(পশ্চিম) গ্রামটিতে৷ প্রায় দেড় যুগে পূর্বে নির্মিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ ডুবন্ত বাঁধটি নির্মাণ হওয়ার ৪-৫ বছর পরই নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়৷ বাঁধটি পুণরায় আর নির্মাণ করা হয়নি৷
উক্ত গ্রামে প্রায় ৮-১০ হাজার লোকের বসবাস৷ জনগণ তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর জন্য কোনো রাস্তা না থাকায় অনেকেই ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সন্তানদের পড়াশোনা করাতে পারছেন না৷
তাই বলে কোন রকম পঞ্চম শ্রেণি পড়েই বিদ্যালয় ছেড়ে দিচ্ছে অনেক শিক্ষার্থীরা ৷ যদিও কেউ কেউ কষ্ট করে স্কুলে যায় তা-ও আবার বর্ষাকালে সপ্তাহে দুই-তিন দিন যেতে পারে৷ বর্ষাকালে পরিকল্পনাই করতে হয় যেদিন বৃষ্টি না হবে সেদিন স্কুলে যাবে৷ অত্র গ্রামে লোক সংখ্যা প্রায় আট-দশ হাজার৷ গ্রামটির সামনে দিয়ে বহে যাওয়া আঁকাবাঁকা গোমতি নদীটি শতশত মানুষের বাড়ি-ঘর গিলে ফেলেছে৷ এমনিতেই মানুষ এখানে সেখানে জমিতে বাড়ি বানিয়ে কোন রকম বসবাস  করছে এর মধ্যে অাবার রাস্তার বেহাল অবস্থার কারনে ছেলে মেয়েদের পড়ার স্বপ্নটা অংকুরেই বিনিষ্ট হয়ে যাচ্ছে৷ অত্র গ্রাম থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে নারান্দিয়া কলিমিয়া উচ্চ বিদ্যালয়৷ এ গ্রামের ছেলে মেয়েদের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সেটিই একমাত্র প্রতিষ্ঠান৷ কিন্তু শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাওয়া অাসার কোনো রাস্তাই নেই৷ বর্ষাকালে গোমতির অতি প্রবাহে সমগ্র এলাকা প্লাবিত হয়ে ডুবে যায়৷ এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে যাওয়ার রাস্তাও থাকে না৷
সর্বত্র পানি আর পানি৷ গ্রীষ্মকালে একটু বৃষ্টি হলোই বাড়ির ভেতর দিয়ে অতি সরু পথে কাঁদা সৃষ্টি হয় যে খালি পাঁয়েও হাঁটা যায় না৷ এ গ্রামের অনেক বাড়িই একটি অপরটির সাথে সংযোগ নাই ৷ বর্ষাকালে বাড়িগুলো মনে হয় যেন ফেনা পানিতে ভাঁসছে৷ উক্ত গ্রামে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও সেটি গ্রামের এক কর্ণারে হওয়ায় দূরের শিক্ষার্থীরা একটু বৃষ্টি হলেই স্কুলে যেতে পারছে না৷ তাছাড়াও সেটার শিক্ষার মান তেমন ভালো না হওয়ায় অভিভাবকেরা একটু ভালো পড়াশোনা করানোর আশায় আসমানিয়া বাজারে কিন্ডার গার্টেনে পাঠান৷ সেখানে যেতে আবার দেশীয় খেয়া নৌকা দিয়ে গোমতি নদী পাড়ি দিতে হয় ৷ কারণ নদীর উপরে নেই কোন ব্রিজ বা পারাপারের অন্য কোন ব্যবস্থা৷ শিশুদেরকে স্কুলে পাঠিয়েও অভিভাবকেরা আশংখা ও চিন্তিত থাকতে হয় এবং গোমতি পাড়ি দেয়ার পূর্বে সকল অভিভাবকেরাই ভঁয়ে ভীতি সন্তস্থ থাকতে হয়৷ সব মিলিয়ে শিশুদেরকে সুশিক্ষায় পাঠাতে যতো বাঁধা ৷ এহেন অবস্থা দেখে গ্রামের অনেক ছেলে মেয়েই ইচ্ছা থাকলেও শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে৷ যদি কষ্ট সহ্য করে পঞ্চম শ্রেণিতে পাশ করে ৫০ জন তাহলে এসএসসিতে পরীক্ষাই অংশ গ্রহণ করে ১০-১২ জন৷ গ্রামের মানুষ কোথাও ব্যবসার উদ্দেশ্য কিংবা অফিসের সেবা পেতে শহরে গেলে সন্ধ্যার পর পরই ফিরার পরিকল্পণা করতে হয়৷ কারণ সন্ধ্যার পর নদীতে সে দেশীয় খেয়া নৌকাটি  থাকে না৷ সব মিলে তিতাস উপজেলায় এমন কোন গ্রাম পাওয়া যাবে না যে গ্রামটি নারান্দিয়া(পশ্চিম) এর মতো এতো অবহেলিত ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন৷ অত্র গ্রামের অনেক মানুষ আছে যাদের বাড়ি গোমতিতে বিলীন হয়েছে একাধিকবার৷
মোট কথা, এ গ্রামের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য একটি সড়ক না থাকায়, ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেক ছেলে মেয়েরাই শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে৷ যুবকেরা তো বিদেশ যাওয়া ছাড়া স্বনির্ভর কোন কাজের কথা ভাবতেই পারছে না ৷ আশে পাশের অনেক গ্রামই আছে যেগুলোতে এক সময় খালি পায়ে হাঁটা যাচ্ছিল না, এখন সেগুলোতে গাড়ি দিয়ে যাওয়া যাচ্ছে ৷ অথচ নারান্দিয়া (পশ্চিম) গ্রামে কেউ একটি সাইকেল নিয়ে যাওয়ার কথাও চিন্তা করতে পারছে না ৷
অত্র গ্রামের সর্বসাধারণ প্রায়ই দীর্ঘশ্বাস ফেলে যে, তাঁরা একটি পরিপূর্ণ রাস্তার অভাবে যাতায়তে খুবই কষ্ট পাচ্ছেন এবং ছেলে মেয়েদেরকে রীতিমতো স্কুলে পাঠাতে পারছেন না৷ শুধু তা-ই নয়; বর্ষা কালে ঘর থেকেও বের হতে পারছেন না ৷ দীর্ঘ দিন যাবত তারা রাস্তাটি নির্মাণের জন্য দাবী করে আসলেও এর কোন সুরাহা হচ্ছে না৷ তারা কোথায় তাদের প্রাণের কথাটি বললে তাদের দাবী বাস্তবায়ন হবে তা ভেবে কুলকিনারা পাচ্ছেন না৷ সরকার আসে সরকার যায়, কিন্তু তাদের দাবীর প্রতি কেউ কর্ণপাত করে না৷
এমতাবস্তায়,  গোমতী নদীর ভাঙ্গনরোধসহ  নারায়নপুর দক্ষিন প্রান্ত থেকে নারান্দিয়া(পশ্চিম) পর্যন্ত মাত্র দুই কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটি পুণরায় নির্মাণ করে তা পরিপূর্ণ সড়কে পরিণত করে  যোগাযোগ ব্যবস্থার সুযোগ সৃষ্টি করে কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ প্রদান করতে সরকারের নিকট আবারো দাবী জানাচ্ছি৷
তথ্য সংগ্রহ ও  লেখক – মোহাম্মদ মহসিন মিয়া

10,694 total views, 1 views today

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Lost Password?